
বছরের সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত
- আপলোড সময় : ৩০-০৯-২০২৪ ১২:২৮:৪৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-০৯-২০২৪ ১২:২৮:৪৩ পূর্বাহ্ন


* চলতি বছরের সর্বোচ্চ ১২২১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত
* গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু
* ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৭৮৬ জন
* চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হয়েছে ১৫৮ জন
দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গু নিয়ে চলতি বছরের রেকর্ড এক হাজার ২২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৭৮৬ জনে। এ সময় নতুন করে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে মশাবাহিত রোগটিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৮ জনে। এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর রেকর্ড ৯২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেছে, সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ২২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়ই ৪৩৪ জন রয়েছেন। এছাড়া ঢাকা বিভাগে ২৬৭ জন, বরিশালে ৭৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮৩ জন, খুলনায় ১৩৪ জন, ময়মনসিংহে ৪৮ জন ও রাজশাহীতে ৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৯ হাজার ৭৮৬ জন। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ নারী। ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত ১৫৮ জনের মধ্যে ৫১ দশমিক তিন শতাংশ নারী এবং ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ।
প্রতি বছর বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত বছর দেশে তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ঢাকায় এক লাখ ১০ হাজার ৮ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন তিন লাখ ১৮ হাজার ৭৪৯ জন। গত বছর এক হাজার ৭০৫ জন মশাবাহিত এই রোগে মারা গেছেন, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু।
এর আগে ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন মারা যান।
তবে আবহাওয়া যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বর্ষাকালে ডেঙ্গুর মতো বাহকনির্ভর রোগের প্রকোপ বাড়ছে। আবার শুকনো মৌসুমে এসব শহরে বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যাতে মূল ভূমিকা রাখছে বায়ুদূষণ। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়াচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে।
বৈশ্বিক আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থাটি বলছে, এক ঋতুর সঙ্গে আরেক ঋতুর যে তফাৎ, বাংলাদেশে তা মুছে যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায়। সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন বিপদ। মৌসুম হোক বা না হোক, ডেঙ্গুর মতো বাহকনির্ভর রোগের প্রকোপ বাড়ছে শহর এলাকায়।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, আর্দ্রতা কমে আসার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে জনস্বাস্থ্যের ওপর এরই মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগামী দিনগুলোতে তা আরও বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর তার ফলে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে ঋতুভেদে আবহাওয়ার বৈচিত্র্য। প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময়টা একটু একটু করে বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে গরম। ক্যালেন্ডারে যে সময়টায় শীত থাকার কথা, তখনও তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গড় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে বর্ষাকাল। অথচ যে সময়টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হতো আগে, সেই জুন-আগস্ট মৌসুমে গড় বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে। এর ফল হচ্ছে অন্যরকম। এ সময়টায় যেসব রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তা আরও বেশি সময় ধরে ছড়ানোর মতো উপযুক্ত তাপমাত্রা ও বৃষ্টির পরিবেশ পাচ্ছে। দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে পুরো বিশ্বেই এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতি এক দশকে দ্বিগুণ হচ্ছে। বর্ষাকালের তুলনায় শুকনো মৌসুমে সংক্রামক রোগের প্রবণতা ১৯.৭ শতাংশ কমে আসে। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি প্রযোজ্য। এসব রোগে প্রতি বছর যতসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়, তার ২৫ শতাংশ হয় বর্ষাকালে। আর শীতকালে হয় ১৪ শতাংশ। এর মানে হলো বর্ষাকালের দৈর্ঘ্য বাড়লে এসব রোগের মৌসুমও দীর্ঘ হবে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল ২০১৯ সালে। ওই বছরের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল, তার অর্ধেকই ঢাকায়। আর ঢাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার ছিল সারা দেশে মোট মৃত্যুর ৭৭ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ভারী বর্ষণের সঙ্গে পরের মাসগুলোর অনুকূল তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল। আবহাওয়া যেভাবে বদলে যাচ্ছে, তাতে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বর্ষাকালে ডঙ্গুর মতো বাহকনির্ভর রোগের প্রকোপ বাড়ছে। আবার শুকনো মৌসুমে এসব শহরে বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যাতে মূল ভূমিকা রাখছে বায়ুদূষণ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গবেষণায় দেখা যায়, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উদ্বেগে ভোগার প্রবণতাও বেড়ে যায়। আর গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ে বেশি। নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি মাত্রায় উদ্বেগে ভোগেন। জলবায়ু বদলে যাওয়ার প্রবণতা যত দ্রুত হচ্ছে, স্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও ততই বাড়ার শঙ্কা দেখা যাচ্ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। আর ২১০০ সাল নাগাদ তা বেড়ে যেতে পারে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ২০৪০ থেকে ২০৫৯ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে ৭৪ মিলিমিটার।
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ